ঢাকা      শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০ আশ্বিন ১৪২৭
IMG-LOGO
শিরোনাম

মধুপুর গড়ে মজুরী বৈষম্যের শিকার নারী শ্রমিকরা

IMG
31 May 2020, 2:18 PM

টাঙ্গাইল, বাংলাদেশ গ্লোবাল: মহামারী করোনা ভাইরাসের মধ্যে মধুপুর গড় এলাকার নারী দিন মজুর শ্রমিকরা স্বাস্থ্য ঝুকি নিয়ে মাঠ ঘাটে দিন মজুরির কাজ করছে। অভাব অনটনের সাথে পাল্লা দিয়ে এসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দরিদ্র গারো সম্প্রদায়, কোচ, বর্মন ও অন্যান্য জাতি গোষ্ঠির নারীরা পুরুষের পাশাপাশি জীবন জীবিকা ও তাদের মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করার পরও তাদের আক্ষেপ অনুশোচনা রয়েছে ন্যায্য মজুরী না পাওয়া নিয়ে। একসাথে একই কাজে যেখানে পুরুষ শ্রমিকরা প্রতিদিন পাচ্ছে ৩শ থেকে ৫শ টাকা সেখানে নারী শ্রমিকরা পাচ্ছে ২শ থেকে ২৫০ টাকা। নারী শ্রমিকদের দাবী মজুরী বৃদ্ধির।

পাপড়ি দালবত। বয়স ৩৬ বছর। তার বাড়ি গারো পল্লীর মধুপুরের পূর্ব ধরাটি গ্রামে। ধরাটি গ্রামে রয়েছে আনারস কলার বাগান। আছে কৃষি কাজে শ্রমন দেওয়ার সুযোগ। কারোনা কালেও প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কাচি, ছেনি, দা, কোদাল নিয়ে পুরুষের মতো কাজের সন্ধানে বের হন পাপড়ি দালবত। একই জমিতে একই সাথে পুরুষও কাজ করে। সেখানে পুরুষের মজুরি ৩শ-৫শ টাকা আর তার মজুরি আড়াইশ টাকা। বেতন বৈষম্যের ব্যাপারে পাপড়ি জানান, তারা নারী বলে তাদের বেতন কম দেওয়া হয়।

কাজ সমান করলেও বেতন সমান দেওয়া হয় না। একই গ্রামের মিলনী নকরেক (৪৫) । স্বামী ২ ছেলে ও মেয়ে নিয়ে তার সংসার। তিনি মজুরি ভিত্তিতে ফসলের মাঠে দিন মজুরের কাজ করেন। তার মজুরি দৈনিক ২শ৫০ টাকা। স্বামীর মজুরি ৩শ টাকা। ২জনে যে মজুরি পান তা দিয়ে সংসার চলে। অভাবের সংসার। নিত্যদিন কাজ করতে হয়। কাজ না করলে খাদ্যের যোগান হয় না। অন্যের জমিতে কাজ করাই তার পেশা।

এভাবে একই গ্রামের পারভিন স্কুল (২৫), সিলচি জেত্রা (৩০), লুসিমা মানখিন(৩০) ও সাইনামারী গ্রামের প্রেনিতা নকরেক(৪৫), লাবনী চিরান(৩০), সোমা মৃ(৪৫), রাজঘাটি গ্রামের চন্দ্রা নকরেক(৫০), ববিতা নকরেক(৩৫), সেলিনা দালবত(৪৮) প্রান্তিক জনগোষ্ঠির এই নারীরা জানান, অভাব অনটনের কারনে অন্যের জমিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। পুরুষের পাশাপাশি তারাও কাজ করে।

মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় গারো নারীরা কৃষি কাজে ব্যাপক শ্রম ঘাম দিয়ে থাকে। কৃষি কাজে রয়েছে তাদের অভিজ্ঞতা। সমানতালে পুরুষের সাথে কাজ করেন। কোন অসুবিধা হয় না। ধান কাটা, চারা রোপন, জমি নিড়ানী, ফসলকাটা, কলা বাগানের পরিচর্যা, আনারস বাগানে কাজ সহ গৃহস্থালির নানা কাজে তারা পারদর্শি। তারা জানান, মধুপুর গড় এলাকায় গারো নারীরা কৃষি কাজে অনেকটা এগিয়ে।

কলা বাগান , আনারস বাগান ধান চাষসহ নানা কাজ করে তারা ব্যাপক পারদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন। রেখেছেন কৃষি কাজেও। গড় এলাকায় কৃষি কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের হাতে ফলছে সোনার ফসল। তারা আরও জানান, একই সাথে একই সমানকাজ করেও সমান মজুরি পান না। তাদের মতে পুরুষ বলে কথা।

পুরুষ হিসেবে তারা দৈনিক ৩শ-৫শ টাকা পান। আমরা নারী বলে ২শ-২৫০ টাকা মজুরি পাই। পাপড়ি দালবত, মিলনী নকরেক, লুসিমা মানখিন, নির্মলা নকরেক, লোপিয়া ম্রং, প্রেনিতা নকরেক, লাবনী চিরান, সান্তনা চিরান, সোমা মৃ, ববিতা নকরেক ও সেলিনা দালবতই নয় তাদের মতো মধুপুর গড় এলাকা চাপাইদ, সাইনামারী, নয়নপুর, কোনাবাড়ি, ধরাটি, মমিনপুর, দোখলা, পীরগাছা, বেদুরিয়া, কাকড়াগুনি, জালাবাদা, জয়নাগাছা, গায়রা, জাঙ্গালিয়া, বেরিবাইদ, মাগন্তিনগর, গেৎচুয়া, টেলকিসহ প্রায় ৫০টি গ্রামে নৃ-গোষ্ঠির গারো কোচ নারী কৃষি কাজে দিন মজুরের কাজ করে থাকে।

কাজে আছে অফুরন্ত শ্রম,মেধা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলার দুরন্ত সাহস। আছে মজুরি কম পাওয়ার বেদনা এরই মাঝে তার জীবন জীবিকার জন্য কাকডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রম দিয়ে গড় এলাকার কৃষি ফসলের মাঠকে করছেন সোনায় পরিনত।

কৃষিও কৃষকের ভাগ্য বদলালেও তাদের কোন ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে না। তবুও তাদের নেই কোন আপসোস। তারা জানে তারা প্রতিদিন রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাঠে কাজ করতে হবে। মজুরি এনে আহারের ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবেই চলছে গড় এলাকার কয়েক হাজার নৃ- গোষ্ঠির গারো কোচ নারীদের জীবন জীবিকা ও পথচলা। তাদের দাবি তাদের শ্রমকে মূল্যায়ন সহ ন্যায্য মজুরি পাওয়ার। বৈষম্যের কারনে তাদের সামাজিক মর্যাদা কম পাচ্ছে। নারী শ্রমের স্বীকৃতি পেলে তারা ন্যায্য মজুরি পাবেন এমনটাই তাদের আশা।

পীরগাছা কোচ পল্লীর সুমিত্রা রানী কোচ (৪৮) বলেন, অন্যের কাজ করি। তার মতে স্বামী-স্ত্রী ২জনে মিলে কাজ করে উর্ধ্ব মূল্যের বাজারে কম মজুরী পেয়ে সবকিছু কিনে খেতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হয়। রুপালী রানী (৪০) জানালেন, ছেলে মেয়েদের যাতে এ কাজ না করতে হয় সে জন্য পড়াশোনায় দিয়েছেন। শত কষ্ট স্বীকার করে সকালে রান্না-বান্না করে ছেলেমেয়ের খাইয়ে তারপর তারা মাঠে ছুটেন কাজের সন্ধানে। দিন মজুরি ছাড়া যখন চুক্তি ভিত্তিতে কাজ করেন তখন তারা পুরুষের সমান মজুরি পান। তবে চুক্তি কাজে সুযোগ কম। ফলে তাদের দৈনিক মজুরিতে কাজ করতে হয়।

করোনা কালীন সময়ে সামাজিক দূরত্ব, স্বাস্থ্য ঝুঁকি, মাস্ক ব্যবহারসহ নানা বিষয়ে তারা জানান, এসব জেনেই আমরা কি করব? ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। দিন রোজগার করি দিন খায়। কাজ না করলে মুখে আহার যাবেনা। করোনাকালীন সময়েও তাদের কাজ থেমে নেই। এ সময় তারা কেউ কেউ সরকারী বেসরকারী কিছু সহযোগীতা পেয়েছে। অনেকেই পাননি।

এ ব্যাপারে মধুপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নারী নেত্রী যষ্ঠিনা নকরেক জানান, নারীরা সকালে বাড়ীর কাজ করে মাঠের কাজও করে। তারপরও মজুরি বৈষম্য এখনও নারীরা পিছিয়ে আছে।

আ’বিমা কালচারাল ডেভেলপমেন্ট ফোরামের নির্বাহী পরিচালক অজয় এ মৃ জানান, কৃষিতে নারীকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। নারী পুরুষের সম অধিকারের কথা বললেও নারীরা সেটা পাচ্ছে না। কৃষি কাজের ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরা মজুরি বৈষম্যের শিকার। তাদের কাজের মূল্যায়ন হচ্ছে না। নারীদের কাজের মূল্যায়ন, কৃষক হিসেবে স্বীকৃতী ও ন্যায্য মজুরির দাবি তার।

সাম্প্রতিক খবর জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা সাবস্ক্রাইব করুন YouTube

সর্বশেষ খবর

আরো পড়ুন