ঢাকা      মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০, ৫ কার্তিক ১৪২৭
IMG-LOGO
শিরোনাম

খাদ্য নিরাপত্তা ও বাংলাদেশ

IMG
15 October 2020, 12:37 PM

মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন: করোনা ভাইরাসের প্রভাবে পৃথিবী জুড়ে নেমে এসেছে মানবিক দুর্যোগ। ইতোমধ্যে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে সারাবিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি অতিক্রম করেছে এবং নয় লাখের অধিক মানুষ ভাইরাসটিতে মারা গেছেন। করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী। নিজ নিজ দেশের জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার সরবরাহের তাগিদে খাদ্যপণ্য রফতানি সীমিত অথবা বন্ধ করে দিতে পারে রফতানিকারক অনেক দেশ। ফলে খাদ্য আমদানিকারক দেশগুলো খাদ্যপণ্যের সংকটে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা (এফএও) আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, বিশ্বজুড়ে খাদ্যের সংকট তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘ শিশু তহবিল এবং আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের যৌথ উদ্যোগে ১৫ জুলাই ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। দেশে করোনা ভাইরাসজনিত রোগ এর বর্তমান পরিস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৩১ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। এর একটি হচ্ছে ‘খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে। অধিক ফসল উৎপাদন করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যা যা দরকার করতে হবে। কোন জমি যেন পতিত না থাকে।’

বাংলাদেশ বিগত তিন দশকে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি টেকসই উন্নতি সাধন করেছে। জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হওয়া সত্তেও এই সময়কালে খাদ্য উৎপান বৃদ্ধির হার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের তুলনায় বেশি ছিল। জাতীয় পর্যায়ে মাথাপিছু ক্যালরি প্রাপ্তির নিরিখে বাংলাদেশ খাদ্যশষ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে । আয়বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাস এই ইঙ্গিত দেয় যে; সময়ের সাথে সাথে দেশে খাদ্য প্রাপ্তির সুযোগ বেড়েছে।

আমাদের দেহটাকে একটি ইঞ্জিনের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। ইঞ্জিন জ্বালানি পুড়িয়ে শক্তি উৎপাদন করে। সেই শক্তি দিয়েই চলে। আমাদের দেহের সব ধরনের কাজের জন্যই শক্তি দরকার হয়, আর এ শক্তি আসে আমাদের খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে। আমাদের দেহের সব অঙ্গ-প্রতঙ্গ যেসব উপাদান দ্বারা গঠিত, ওই উপাদানগুলো প্রতিনিয়িত কিছু না কিছু পরিবর্তিত হয়। একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে- হাড়ে যে ক্যালসিয়াম আছে তা থেকে প্রতিদিন ৭০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম বের হয়ে আসে এবং খাবার থেকে ঐ ক্যালসিয়াম হাড়ে যায়। এভাবে অন্যান্য অনেক উপাদান দেহ থেকে বেরিয়ে যায় এবং খাবার থেকে ওইসব উপাদান এসে সে স্থান দখল করে। তাহলে সহজেই বোঝা যাচ্ছে যে, খাবারের এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যাবতীয় কাজকর্মের জন্যই পুষ্টিকর নিরাপদ খাদ্য প্রয়োজন। পুষ্টির বিষয়ে গ্রামাঞ্চলে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ যেন সুষম খাদ্য পায়। গ্রামের মানুষের পুষ্টি নিশ্চিতে জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি।

খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা অতীব জরুরি। বর্ধিত ফসল উৎপাদন করার জন্য প্রয়োজন উচ্চফলনশীল জাত, উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনা এবং একক জমিতে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা। ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা ও উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনার একটি অঙ্গ হচ্ছে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, ফসলের উৎপাদন খরচ ও ফসল কর্তনোত্তর ক্ষতি কমানোর মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। আর এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন ও কাঙ্ক্ষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি অর্জনে খাদ্য নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে কয়েকটি ধাপে একগুচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় যার মধ্যে রয়েছে খাদ্যের লভ্যতা বৃদ্ধি, বিশেষ করে পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্যের ভৌত ও অর্থনৈতিক প্রাপ্যতা নিশ্চিত এবং খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা হ্রাস করা।

মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম হলো খাদ্য। তাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য মানুষের এ মৌলিক চাহিদা যেন নিশ্চিত হয়। গত কয়েক দশকে দেশের জনসংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় তার সমহারে বিপরীতমুখী প্রবণতায় কৃষি জমি কমে গেছে। এ ছাড়াও কৃষি উৎপাদনে ঋণাত্মক ভূমিকার প্রভাবকগুলো যেমন আবহাওয়া পরিবর্তন, বন্যা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, পোকামাকড়ের উপদ্রব ইত্যাদির কারণে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদার সঙ্গে তালমিলিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়াস অব্যাহত আছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সনে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। তখন মানুষ ছিল সাড়ে ৭ কোটি। দেশে এখন মানুষ প্রায় ১৭ কোটি। মানুষ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। আবাদি জমি প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ার পরও খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে তিন থেকে পাঁচ গুণ। ১২টি কৃষিপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে রয়েছে। খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়ানোর গতিতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তালিকায় এখন বাংলাদেশ।

সাফল্যের ধারাবাহিকতায় গত একবছরে লাভজনক ও বাণিজ্যিকীকরণের অগ্রযাত্রায় কৃষি। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন (৪৩২.১১ লাখ মেট্রিক টন) এর লক্ষ্যমাত্রা (৪১৫.৭৪ লাখ মেট্রিক টন) ছাড়িয়ে গেছে। দেশ আজ চালে উদ্বৃত্ত; ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ। ভুট্টা উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ৪৬ লাখ মে: টন। নিবিড় চাষের মাধ্যমে বাংলাদেশ সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে উন্নীত হয়েছে। সবজি উৎপাদন বেড়ে ১ কোটি ৭২ লাখ ৪৭ হাজার মেট্রিক টন হয়েছে। আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত এবং বিশ্বে সপ্তম। এবছর আলু উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৯ লাখ মেট্রিক টন। দেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম এবং পেয়ারায় অষ্টম। আম উৎপাদন প্রায় ২৪ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে।

একই জমিতে দুই বা ততোধিকবার চাষ তো হচ্ছেই। ক্ষেত্র বিশেষে চারবারও কোনো কোনো জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নেও বাংলাদেশ সফলতার পরিচয় দিয়েছে। ক্ষুধা সূচকেও বাংলাদেশের অগ্রগতি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে। ২০১৩ সনের ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (IFPRI) প্রতিবেদনে দেখা যায়, মাত্র এক বছরেই এ সূচকে ১১ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। দেশে এখন আর চাল আমদানি করতে হয় না। পর্যাপ্ত মজুদ রেখে বর্তমানে চাল রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যানেল (IPCC) তাদের চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলেছিল, চলতি শতকের মধ্যে বাংলাদেশের ধান ও গমের উৎপাদন যথাক্রমে ২০ ও ৩০ শতাংশ কমবে। কিন্তু উৎপাদন কমেনি বরং তাদের ভবিষ্যৎ বাণীকে ভুল প্রমাণ করে গত পাঁচ বছরে ধান ও গমের উৎপাদন গড়ে ২.৫ থেকে ৩.০ শতাংশ হারে বেড়েছে।

কোনো বাসস্থানকে তখনই ‘খাদ্য নিরাপদ’ বলা যায়, যখন এর বাসিন্দারা ক্ষুধার্ত অবস্থায় বসবাস করেন না। বাংলাদেশে এখন একটি লোকও পাওয়া যাবে না যে না খেয়ে রাত্রি যাপন করে। বাংলাদেশে এখন পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য মজুত আছে। বর্তমান সরকার দেশের দক্ষিণাঞ্চলে দানা শস্য উৎপাদনের কার্যক্রম সম্প্রসারিত করায় খাদ্য নিরাপত্তা আরও নিশ্চিত হয়েছে। খাদ্যের ভাণ্ডার হাওর অঞ্চলে রাস্তাঘাটসহ অন্যান্য অবকাঠামো বৃদ্ধির কার্যক্রম চলছে, এলাকা উন্নয়নের আরও পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সে অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন ও ছোটোখাট শিল্প স্থাপনের জন্য সহজ শর্তে ঋণ বিতরণ, এসএমই ঋণের সম্প্রসারণসহ অনেক প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন; যা এ অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন ও উৎপাদনে ভূমিকা রাখবে।

সরকার করোনা ভাইরাসজনিত আপদকালীন সময়ে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং বোরো মৌসুমে বরাদ্দকৃত অর্থের মাধ্যমে কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপারসহ বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশেষভাবে ধান কর্তনের সময় কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার যন্ত্র ব্যবহারের ফলে বোরোর সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া গেছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও কৃষিতে সাফল্যের ধারা বজায় রেখেছে বাংলাদেশ। কৃষির উন্নয়নে একাধিক আইন ও নীতিমালা হয়েছে। বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ অবদান কৃষির।

দেশে প্রায় ১.৪৭% হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর ২ থেকে ২.৫% হারে (৩.৫ লাখ টন) খাদ্যশস্যের চাহিদা বাড়ছে আর আবাদি জমি হ্রাস পাচ্ছে ১% হারে। বর্তমানে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৩ কোটি ৬২ লাখ টন চাল প্রয়োজন; যদিও উৎপাদন এর চেয়ে বেশি হচ্ছে। ক্রমহ্রাসমান জমি থেকে পারিবারিক খামারের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে হবে। দেশে বর্তমানে ১ কোটি ১৮ লাখ বসতভিটা আছে। পরিবারের খাদ্যশস্য, শাকসবজি ও ফলমূলের চাহিদা মিটানোর জন্য প্রতিটি বসতবাড়িকে খামারে রূপান্তর করতে হবে। বর্তমান সরকারের কৃষিক্ষেত্রে একটি বড়ো কর্মসূচি হচ্ছে ‘একটি বাড়ি একটি খামার।

সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু হলো একটি পরিবার। কাজেই পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ হলে সভ্যতার ক্রমবিকাশও সহজ হয়। পুষ্টির অভাবে মানুষের স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনার বিকাশ ব্যাহত হয়। মানুষকে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যে ফিরিয়ে আনতে সুস্থ মানুষের প্রয়োজন। এ সুস্থ মানুষ সৃষ্টির জন্য পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ জরুরি। ২০৩০ সাল নাগাদ দেশকে টেকসই উন্নয়নে সফল অংশীদার করার প্রত্যয়ে বাংলাদেশ। এ সময়ের মধ্যে টেকসই খাদ্য উৎপাদনের ধারা নিশ্চিত করতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহনীয় কৃষি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন সরকারের অঙ্গীকার। শুধু সরকারি উদ্যোগ নয় সরকারের পাশপাশি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

সাম্প্রতিক খবর জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা সাবস্ক্রাইব করুন YouTube

সর্বশেষ খবর

আরো পড়ুন