ঢাকা      বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
IMG-LOGO
শিরোনাম

শিশু অধিকার

IMG
16 November 2020, 4:56 PM

মো. নূরুল আবছার: শিশু অধিকার সনদের সজ্ঞা অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে সবাই শিশু। দেশ ও জাতির সমৃদ্ধির ধারক বাহক আজকের শিশু-কিশোররা। এ সময়টা জীবনের ভীত মজবুত করার। শিশুবয়স হলো লেখাপড়া, শরীরচর্চা, নিয়মানুবর্তিতা, ভদ্রতা, শৃঙ্খলাবোধ ইত্যাদির সংমিশ্রণ, যদিও আজকাল অনেক শিশু-কিশোদের মধ্যে এসব গুণাবলী তেমনভাবে পরিলক্ষিত হয়না। তারা জড়িয়ে যাচ্ছে সমাজের নানা অনাকাংখিত কর্মকা-ের সাথে।

আমাদের বর্তমান প্রজম্মের শিশু-কিশোররা বিশেষ করে যারা শহরাঞ্চলে থাকে, তারা মাঠে বা বাইরের খেলাধুলার চেয়ে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটে সময় কাটাতেই বেশি পছন্দ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে না দেয়াই ভালো। তবে করোনাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিশুদের ক্লাস করতে হচ্ছে অনলাইনে। সেক্ষেত্রে স্মার্টফোন ব্যবহার করতেই হয়। শিশুরা স্মার্টফোন ব্যবহার করলেও তা অভিভাবকদের নজরদারিতে থাকা আবশ্যিক।

শিশুর মানবাধিকার এবং সকল শিশুর জন্য অধিকার অর্জন করতে হলে সব দেশের সরকারকে শিশু অধিকার সনদে উল্লিখিত বিষয়গুলো অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। এ সনদ ইতিহাসের সবচেয়ে সর্বজনীন মানবাধিকার দলিল। দলিলটি অনুমোদনের মাধ্যমে সনদে স্বাক্ষরকৃত দেশেরে সরকারগুলো শিশুদের অধিকার রক্ষা ও নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছে এবং এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রাদায়ের কাছে নিজেদের দায়বদ্ধ করেছে। শিশুদের বেঁচে থাকা ও বিকাশের অধিকারসহ, নির্যাতন ও শোষণ থেকে নিরাপদ থাকার অধিকার, পারিবারিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনে পুরোপুরি অংশগ্রহণের অধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা উপভোগ করার বিষয় বর্ণিত রয়েছে এ সনদে। সনদের বর্ণিত প্রতিটি অধিকার প্রত্যেক শিশুর মানবিক মর্যাদা ও সুষম বিকাশের জন্য অপরিহার্য। স্বাস্থ্য পরিচর্যা, শিক্ষা ও আইনগত, নাগরিক ও সামাজিক সেবা প্রদানের মান নির্ধারণের মাধ্যমে এ সনদ শিশুদের অধিকার সংরক্ষণ করে থাকে। যে সব রাষ্ট্র এই সনদের শরিক, তারা শিশুদের সর্বোচ্চ স্বার্থের আলোকে যাবতীয় নীতি প্রণয়ন ও কার্যক্রম গ্রহণ করতে দায়বদ্ধ।

জাতির ভবিষ্যৎ শিশুরাই ভবিষ্যতে জাতিকে নেতৃত্ব দেবে। বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে অনুস্বাক্ষর করার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে কাঠামোগত অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করে। তথাপি সামাজিক চর্চায় শিশু অধিকারের বিষয়টি এখনো খানিকটা উপেক্ষিত। এখনো আমাদের অধিকাংশের ধারণা, শিশুরা যেহেতু বয়সে ছোট, তাদের দাবি আদায়ের ক্ষমতা যেহেতু কম। তাদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ কম, অন্নবস্ত্র সবকিছু পরিমাণে তাদের কম লাগে বলে তাদের অধিকারগুলোও বোধহয় মর্যাদায় তুলনামূলকভাবে ছোট এবং তা বাস্তবায়নে তেমন কোনো জবাবদিহি নেই। কিন্তু এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

আমরা জানি, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ শিশু। তারমধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ শিশু দরিদ্র। এই দরিদ্র শিশুদের মধ্যে রয়েছে শ্রমজীবী শিশু, গৃহকর্ম ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু, পথশিশু, বাল্যবিয়ের শিকার শিশু এবং চর, পাহাড় আর দুর্গম এলাকায় বসবাসরত শিশু। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের উন্নয়ন খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে কোনো রকম টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ শিশুদের সার্বিক উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের আইন ও নীতি প্রণয়নে দক্ষিণ এশিয়ায় অনেকখানি এগিয়ে রয়েছে। আমাদের শিশুনীতি, শিশু আইন, শিশুশ্রম নিরসন নীতি, গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, পাচার প্রতিরোধসহ নানা বিষয়ে শিশুদের সুরক্ষামূলক আইন রয়েছে, যা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বাস্তবায়ন করছে। সেভ দ্য চিলড্রেনসহ বাংলাদেশে কর্মরত শিশু অধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের জন্য একটি পৃথক অধিদপ্তরের দাবি জানিয়ে আসছে, যা জাতিসংঘ শিশু অধিকার কমিটিও সুপারিশ করেছে, কিন্তু তার বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী শিশুর ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন যে হারে বেড়েছে, তার প্রতিকারে অনেক আইনি বিধান থাকলেও এই ধরনের কর্মকা- পুরোপুরি প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না।

পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিশু সুরক্ষাবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন দরকার। পরিবার ও স্কুলগুলোয় এখনো শাসনের নামে শারীরিক নির্যাতনের প্রচলন রয়েছে, যা শিশুর বিকাশের পথে অন্তরায়। বিদ্যালয়ে শিশুর শারীরিক শাস্তি বন্ধে সরকারি পরিপত্র থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো শারীরিক শাস্তি দেওয়া হয়। সমাজে শিশুর প্রতি শারীরিক নির্যাতনের সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য যাতে হয়ে না উঠে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা খুবই জরুরি। এ জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, যেখানে সংবাদমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংগঠনগুলো অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।

শিশুদের কল্যাণ, সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চত করতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বপ্রথম ‘শিশু আইন, ১৯৭৪’ প্রণয়ন করেন। পরবর্তীতে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে শিশু আইন যুগোপযোগী করা হয়। তাদের অপরাধ-সংক্রান্ত বিষয়ে বিচার ও তদন্ত শিশু আইন-২০১৩ অনুযায়ী হচ্ছে। শিশু অভিযুক্তের বিচারের জন্য বর্তমানে প্রত্যেক জেলায় শিশু আদালত রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে শিশু আদালতের কাজ করে। দেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মামলা শিশু আদালতগুলোতে বিচারাধীন। শিশুদের বিচারের ক্ষেত্রে ও আদালতে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে শিশু আইন, ২০১৩ এর উল্লিখিত নির্দেশনা মেনে চলা হয়। জেলা সমাজসেবা অফিস, প্রবেশন কর্মকর্তা ও প্রত্যেক থানায় শিশু ডেস্কের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা শিশু অভিযুক্তকে নিয়ে আইনের আলোকে বিভিন্ন প্রকার দায়িত্ব পালন করেন। শিশু অভিযুক্তদের কাজ করার জন্য বেশকিছু সেফ হোম ও কিশোর-কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। শিশু অভিযুক্তরা মূলত জামিনের আগে পর্যন্ত ওই উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে দ- ভোগ করে। অভিযুক্তদের মানসিক উন্নয়নে কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া শিশুদের মানসিক উন্নয়ন, অপরাধ থেকে ফেরাতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

১৭ মার্চ, জাতীয় শিশু দিবস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে প্রতিবছর জাতীয় শিশু দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ জাতিসংঘের গৃহীত অন্য সব প্রধান সনদের মতো সমান গুরুত্বপূর্ণ, যার জন্য প্রতিটি রাষ্ট্রকে জবাবদিহি করতে হয়। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এ পর্যন্ত পাঁচবার শিশু অধিকার বাস্তবায়নে অগ্রগতি সম্পর্কিত প্রতিবেদন জাতিসংঘে জমা দিয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। শিশু দারিদ্র্য মোচনের লক্ষ্যে নানাবিধ অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। শিশুকে অপরাধী সাব্যস্ত করার নূন্যত্তম বয়সের সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিসহ নিরাপদ মাতৃত্ব, জরুরি পুষ্টিসেবা সরবরাহ করা, জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য রক্ষা, বিভিন্ন প্রচারাভিযানের মাধ্যমে শিশুর জীবন রক্ষা এবং সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা দানকারী সেবা ও কর্মসূচিসমূহ বিস্তার লাভ করে চলেছে। শিশুর বেঁচে থাকা এবং তার শারীরিক, মানসিক বিকাশ ও উন্নয়নে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করার সার্বিক প্রচেষ্টা সমাজের সর্বত্রই চলছে। শিশুদের অধিকারগুলো রাষ্ট্রীয়, স্থানীয় ও পারিবারিক কর্মপরিকল্পনায় অধিকতর গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এসব অধিকার দ্রুত ও সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক গণসচেতনতা, শিশু অধিকার বিষয়ে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, ছাত্র সমাজ, এনজিও, নারী সংগঠন, সুশীল সমাজ, বিভিন্ন শিশু সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সর্বোপরি শিশুদের নিজেদের মধ্যে শিশু অধিকার সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার।

বাংলাদেশ শিশুর অধিকার রক্ষায় সঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার প্রতিটি শিশুর অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত আন্তরিক। সরকারের ঐকান্তিক প্রয়াসেই প্রতিবন্ধী এবং অটিস্টিক শিশুর প্রতি সামাজিক ধারনার আমূল পরিবর্তন এসেছে। কাজেই সরকারের পাশাপাশি সবাই সচেতন হলে শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে।

সাম্প্রতিক খবর জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ অথবা সাবস্ক্রাইব করুন YouTube

সর্বশেষ খবর

আরো পড়ুন