ঢাকা      রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ৫ বৈশাখ ১৪২৮
IMG-LOGO
শিরোনাম

সোনালি আঁশের সোনার দেশ; মুজিব বর্ষে বাংলাদেশ

IMG
05 March 2021, 10:15 PM

সৈকত চন্দ্র হালদার: পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরি ফসল। সোনালি আঁশ নামে খ্যাত পাটভিত্তিক শিল্প দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস। বর্তমান সরকারের ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারে পাট ও বস্ত্রশিল্পকে শক্তিশালী, নিরাপদ ও প্রতিযোগিতাসক্ষম করে বাজার সম্প্রসারণ ও রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে পাটখাতের ভূমিকা অপরিসীম। দেশের প্রায় ৪ কোটি লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ খাতের উপর নির্ভরশীল। পাটখাতের উন্নয়নে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পাট শিল্পের পুনরুজ্জীবন ও আধুনিকায়নের ধারা বেগবান করার লক্ষ্যে ‘পাট আইন, ২০১৭’, ‘জাতীয় পাটনীতি-২০১৮’ ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন,২০১০’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ সকল আইন ও নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যে ব্যাপক চাহিদা বৃদ্ধির পেয়েছে।

বর্তমান সরকারের গৃহীত এসকল নীতির কারণে ইতোমধ্যে পাটপণ্যের রপ্তানিতে ব্যাপকহারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবং কৃষক পাট বিক্রি করে লাভবান হচ্ছে । চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম সাতমাসে (জুলাই-জানুয়ারি) পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৭৬৫.৭৩ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এই অংক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৭.০৮ শতাংশ বেশি। আর তা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৪.৫৭ শতাংশ বেশি।

সোনালী আঁশ পাট হতে পলিথিনের বিকল্প পরিবেশবান্ধব সোনালি ব্যাগ, পাটপাতা হতে স্বাস্থ্যসম্মত জৈব পানীয়, জুট-জিও টেক্সটাইল, সয়েল সেভারসহ ২৮২ ধরনের বহুমুখী পাটপণ্য উদ্ভাবনের ফলে স্থানীয় ও বিশ্ববাজারে পাটের বহুমুখী ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন-২০১০’ এর প্রয়োগ ও শতভাগ বাস্তবায়নের ফলে পাটপণ্যের ব্যবহার ও চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বেসরকারি পর্যায়ে ছোটো ও বড়ো আকারের সর্বমোট ২৫৯টি পাটকল চালু রয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে উৎপাদিত ৭৫.৬০ লক্ষ বেল কাঁচাপাটের মধ্যে ৮.৬৪ লক্ষ বেল কাঁচাপাট রপ্তানি করা হয়েছে। একই সময়ে ৭৫২.৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যমানের ৭.৯০ লক্ষ মেট্রিক টন পাটপণ্য বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে। পৃথিবী জুড়ে পাটের কদর ও চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাটচাষিরা ও কাঁচা পাটের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন। চলতি পাট মৌসুমে কাঁচা পাটের গড়দর ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। এর ফলে পাটচাষিরা ভবিষ্যতে অধিক পরিমাণে পাট চাষে আগ্রহী হবে। এতে করে দেশের অর্থনীতিতে পাটখাতের অবদান আরো সুসংহত হবে বলে আশা করা যায়।

মানসম্মত পাটবীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে পাঁচবছরের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় যৌথ উদ্যোগে একটি রূপরেখা তৈরি করেছে । সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত পাটবীজ উৎপাদনে স্বনির্ভর হবে। প্রয়োজনীয় পাটবীজ সংগ্রহে আমদানি নির্ভরতা আর থাকবে না। এ পাট মৌসুম থেকে রোডম্যাপ বাস্তবায়ন শুরু হবে। ধাপে ধাপে তা আগামী পাঁচবছরে শতভাগ বাস্তবায়ন করা হবে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় উচ্চফলনশীল পাট বীজ উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন এবং মানসম্মত পাট উৎপাদনে কৃষকদের উদ্ধুদ্ধকরণ ও সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)-এর আওতায় ‘উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্প চলমান রয়েছে। প্রকল্পটি দেশের ৪৬টি জেলার ২৩০টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে পাটবীজের আমদানি নির্ভরতা হ্রাস করে চাষিদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা এবং পাট চাষে চাষিদের সহযোগিতা প্রদানের নিমিত্ত ৭ লক্ষ ৬৫ হাজার চাষিকে বিনামূল্যে উফশীবীজ, সার, বালাইনাশক এবং কৃষিযন্ত্রপাতি বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া প্রকল্পভুক্ত ৪ লক্ষ ২০ হাজার পাট চাষিকে পাট চাষের উন্নত কলাকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি এবং উচ্চফলনশীল পাটবীজ ব্যবহার করে পাটের একর প্রতি ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলসমূহের অব্যাহত লোকসানজনিত বিরাজমান পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সরকারি সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ জুট মিলস্ করপোরেশন (BJMC)-এর নিয়ন্ত্রণাধীন ২৫টি মিলের শ্রমিকদের চাকুরি অবসায়ন সুবিধার আওতায় অবাসনসহ উৎপাদন কার্যক্রম ০১ জুলাই, ২০২০ তারিখ হতে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমানে কর্মরত শ্রমিকদের প্রাপ্য বকেয়া মজুরি, শ্রমিকদের পেনশন ও আনুতোষিক এবং সে সাথে গ্রাচুইটির সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ হারে অবসায়ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের পাওনা ২.০০ (দুই) লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্ব স্ব ব্যাংক এ্যাকাউন্টে নগদে এবং ২.০০ (দুই) লক্ষের ঊর্ধ্বে পাওনার ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ নগদে এবং বাকি ৫০ শতাংশ তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র আকারে দেওয়া হচ্ছে। একই সাথে পূর্বের অবসর গ্রহণকারী শ্রমিকদের প্রাপ্য সকল পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখাতে সরকারের প্রায় ৭,০০০ কোটি (সাত হাজার কোটি) টাকা ব্যয় হবে। শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং মিলগুলোর যন্ত্রপাতি ও কর্মক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে যতদ্রুত সম্ভব মিলগুলো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP)/বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI)/সরকার-সরকার পর্যায়ে (G2G)/ ভাড়াভিত্তিক ইজারা (Lease) পরিশোধ পদ্ধতিতে পুনঃচালু করার বিষয়ে উপযু্ক্ত পদ্ধতি ও কর্মকৌশল নির্ধারণ সংক্রান্ত কার্যক্রম চলমান আছে। চাকুরি অবসায়নকৃত শ্রমিকগণকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুন:নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্বব্যাপী বহুমুখী পাটপণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনায় রেখে বহুমুখী পাট পণ্যের প্রসার ও বিকাশের লক্ষ্যে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (JDPC) বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন, ব্যবহার, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। জেডিপিসি’র নিবন্ধিত ৭১৮জন উদ্যোক্তা রয়েছে, যারা এ পর্যন্ত ২৮২ প্রকার বহুমুখী পাটপণ্য তৈরি ও ১৩৫টি দেশে বাজারজাতকরণে সক্ষম হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ৭৪তম অধিবেশনের বিশেষ সভায় প্রাকৃতিক ও উদ্ভিজ তন্তু ব্যবহারের পক্ষে গৃহীত সিদ্ধান্তকে কাজে লাগিয়ে বহুমুখী পাটপণ্যের উদ্ভাবন ও বাজার সম্প্রসারণে জেডিপিসি’র সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একে আইনগত ভিত্তি প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

দেশের অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাটখাত উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে । ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য নির্মূলসহ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফল হবে বলে, আশা করা যায়। এক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব পাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ‘রূপকল্প-২০৪১’ এর আলোকে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত সময়ের মধ্যেই উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে সেই স্বপ্ন পূরণে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় বিশেষ অবদান রাখছে।

বাংলাদেশ গ্লোবাল ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

সাম্প্রতিক খবর জানতে লাইক করুন আমাদের Facebook পেজ

সর্বশেষ খবর

আরো পড়ুন