আশরাফুল কবির আসিফ, বাংলাদেশ গ্লোবাল: দীর্ঘ দুই দশক পর সরকারি দলের বৈঠক করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। এর আগে আজ বুধবার সরকারি দলের সংসদীয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১১টায় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সংসদ ভবনের সরকার দলীয় সভাকক্ষে এই সভা হবে।
২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার আগে সংসদ নেত্রী ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর সিনিয়র সহকর্মীদের মধ্যে সাইফুর রহমান, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ইতোমধ্যে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। বেঁচে আছেন কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ আর ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তাঁদের মধ্যে আবার কর্নেল অলি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দল ছেড়ে জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট বেঁধে নির্বাচন করেছেন।
এক নতুন বাস্তবতায় সংসদে সরকারি দলের আসনে বসবে বিএনপি। তারেক রহমানের জন্যও এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। ২০০৪ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হলেও এবারই প্রথম তিনি সংসদ সদস্য হয়েছেন। আর প্রথমবারই তিনি সংসদ নেতা। ফলে সরকার পরিচালনার পাশাপাশি জাতীয় সংসদে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকবে গোটা বিএনপি।
একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, দেশ পরিচালনা আর সংসদে বিরোধী দলের মুখোমুখি হওয়া এক বিষয় নয়। সরকার চালাতে প্রশাসন সহায়ক ভূমিকা হিসেবে কাজ করে। অভিজ্ঞ আমলারা নানাভাবে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সহযোগিতা করেন। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বিরোধী দলকে মোকাবিলা করা খুব সহজ কাজ নয়। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের জন্য তা আরও কঠিন। যেহেতু নিজে ভোটে নির্বাচিত নন, তাই বিরোধী দলতো বটেই; সরকারি দলের এমপিরাও তাঁদের একটু অন্য চোখে দেখেন।
সংসদে কথা বলার সময় অনেক ঝানু রাজনীতিবিদও অতীতে বিপাকে পড়েছেন। এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মাত্র একটি 'শব্দ' কারো ক্যারিয়ার শেষ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। ভালো করে খেয়াল করলে দেখবেন, বেগম জিয়ার ২০০১-০৬ মন্ত্রিসভার অন্তত দু'জন প্রভাবশালী সদস্য এবারের মন্ত্রিপরিষদে ঠাঁই পাননি। সে সময়কার আলোচিত কিছু উক্তি তাঁদের মন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করেন অনেকে।
এবারের সংসদ বেশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে। সরকারি দলের অনেক সদস্য যেমন এবার প্রথমবার এমপি হয়েছেন, তেমনই বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির নতুন এমপিরাও একদম প্রথম দিন থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন। তার উপর বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে জিতে আসা সংসদ সদস্যরাও বিএনপিকে নানাভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলবেন।
এখানেই প্রশ্ন চলে আসে, বিরোধী দলের জবাব দিতে কতোটা প্রস্তুত বিএনপি? একা তারেক রহমান কতো দিক সামাল দিতে পারবেন? আমার মনে হয়, সরকারে অনেক বেশি সময় দিতে হয় বলে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর রাজনীতিতে তিনি আগের মতো মনোযোগ দিতে পারছেন না। এরপর তাঁর উপর কাজের চাপ বাড়িয়ে দেবে, সংসদ নেতার বাড়তি দায়িত্ব।
আর এই প্রসঙ্গে তাঁর জন্য সহজ সমাধান হয়ে আসতে পারে, সরকারি দলের প্রথম বৈঠকেই একজন সংসদ উপনেতা নির্বাচন করা। এক্ষেত্রে তাঁকে এমন একজনকে বেছে নিতে হবে, যিনি মন্ত্রিপরিষদের সদস্য নন। মন্ত্রী না হওয়ায় তিনি তাঁর পুরো ফোকাসটাই জাতীয় সংসদকে দিতে পারবেন। এজন্য 'অটো চয়েস' হতে পারেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তাঁর অভিজ্ঞতা এবং দলের সিনিয়র সদস্য বিবেচনায় তাঁকে এই দায়িত্ব দিতে পারেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে শারীরিক অবস্থা এবং বয়স বিবেচনায় নিলে খন্দকার মোশাররফের বিকল্প হতে পারেন দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান।
এরপরই তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তের বিষয়টি হলো স্পিকার নির্বাচন করা।জাতীয় সংসদকে কার্যকর করতে হলে স্পিকারের পারফরম্যান্স সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বিএনপি সরকারে থাকার সময় আইনজীবীরাই স্পিকার পদের জন্য এগিয়ে থাকতেন। এবারও আলোচনায় আছেন এমপি নির্বাচিত হওয়া বিএনপির সিনিয়র আইনজীবীরা।
খন্দকার মোশাররফ সংসদ উপনেতা হলে বিএনপি স্পিকার পদে মঈন খানকে বেছে নিতে পারে। দলের প্রতি অতীত অবদান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তাঁকে এক্ষেত্রে এগিয়ে রাখবে। তবে তাঁর বেলাতেও বয়স বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিকল্প হতে পারেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান বরিশালের অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন। তিনি অবশ্য এবারই প্রথম এমপি হয়েছেন। আরেক বিকল্প নোয়াখালীর ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন। তবে দলের ভেতরে তাঁর অবস্থান আর আগের মতো নেই বলে রাজনীতিতে কান পাতলেই শোনা যায়!
বিএনপির ঘাঁটি নোয়াখালী থেকে এবার কোনো মন্ত্রী করা হয়নি। এমনকি জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ বা হুইপ পদেও জেলার কাউকে বিবেচনা করা হয়নি। এক্ষেত্রে নোয়াখালীর কেউ স্পিকার হলে আমি অন্তত অবাক হবো না। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নাম সদ্য স্ত্রী হারানো জয়নুল আবদিন ফারুক। বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ ছিলেন। তার চেয়ে বড়ো বিষয়, জাতীয় সংসদ এলাকায় তিনি ভয়াবহভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই একটি বিবেচনাতেই তিনি অনেকের সমর্থন পাবেন। নোয়াখালীর আরেক বিকল্প মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের নতুন সভাপতি বরকত উল্যাহ বুলু। তবে স্পিকার পদে বিএনপি যাঁকেই নির্বাচিত করুক না কেন, সংসদ পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি কতোটা দক্ষতার পরিচয় দিতে পারবেন, তা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকারের পদটি প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি। জুলাই জাতীয় সনদের সমঝোতার প্রতি সম্মান জানিয়ে সংসদে ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দল থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে। তবে এই পদ নেয়ার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি জামায়াত।
শেষ পর্যন্ত জামায়াত ডেপুটি স্পিকার পদ না নিলে বিএনপি উপরে আলোচিত যে কাউকে ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব দিতে পারে। তবে এই পদের জন্য আরও দু'টি নাম বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। একজন ব্যারিস্টার নওশাদ জমির সানি। তাঁর বাবা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার দীর্ঘদিন স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছেন। আরেকজন ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ।
ব্রেকিং নিউজ, এই মুহূর্তের খবর, প্রতিদিনের সর্বশেষ খবর, লেটেস্ট নিউজ এবং গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিউজ পেতে ভিজিট করুন www.bangladeshglobal.com