ঢাকা      শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
শিরোনাম

এক ‘স্মার্ট’ মায়ের গল্প

IMG
23 February 2024, 10:49 AM

নাসরীন মুস্তাফা,কথাসাহিত্যিক, পিআইডি ফিচার: সত্য ঘটনা অবলম্বনে একটি গল্প বলি। কয়েক বছর আগের কথা। মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসে এক সকালে এলেন মধ্যবয়সিী প্রবাসী দম্পতি। আরবদের মতো পোশাক স্বামীর, আপাদমস্তক আচ্ছাদিত স্ত্রীরও তাই। চট্টগ্রামের কোনো এক জায়গায় স্ত্রীর পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত বাড়িসহ জমি আছে। স্বামীর পরামর্শে ভ‚মিসেবার কিছু কাজ করার জন্য স্ত্রী ‘পাওয়ার অব এটর্নি’, অর্থাৎ দায়িত্বপালনের ক্ষমতা অর্পন করছেন দেশে বাস করা স্বামীর বন্ধুকে। ‘পাওয়ার অব এটর্নি’র কাগজপত্র কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ইংরেজিতেই করে সবাই। প্রয়োজনীয় সত্যায়নের জন্য দূতাবাসে আসা বেশিরভাগ প্রবাসী এই ইংরেজিতে দাঁত বসাতে পারেন না। জায়গা দেখিয়ে দিলে কোনো মতে কাগজটায় স্বাক্ষর করেন, টিপসইও দেন অনেকে।

সত্যায়নের দায়িত্ব পালন করছিলেন এক নারী কর্মকর্তা। নিয়ম অনুযায়ী তার সামনেই যিনি দায়িত্ব প্রদান করছেন, তার স্বাক্ষর করতে হয়। এর আগে স্ত্রীর কাগজটি এনে স্বামী সত্যায়ন করিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। কর্মকর্তা রাজি হননি। সেজন্য বাধ্য হয়ে সেই সকালে স্ত্রীকে নিয়ে আসতে হয়েছিল অতিশয় ব্যস্ত স্বামীকে। সফল ব্যবসায়ী তিনি, প্রভাবশালীও বটে। কর্মকর্তা নিয়ম অনুযায়ী ইংরেজি কাগজের পাঠোদ্ধার করে সেটার বাংলা করে বলছিলেন স্ত্রীকে। স্বামী বিরক্ত, কর্তৃত্বের স্বরে কর্মকর্তাকে বারবার তাগাদা দিচ্ছেন সময় নষ্ট না করে সত্যায়িত করে দিতে। স্বামীর পাকা কথা, জমিসহ বাড়িটার খাজনা দেওয়া আর পর্চা তোলার কাজ তার বন্ধুকে দিয়ে করাতে স্ত্রী খুশি মনেই সম্মতি দিয়েছেন। স্ত্রীও মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন। কিন্তু কর্মকর্তা দায়িত্বের পরিধি বাংলায় অনুবাদ করে পড়ে শোনানোর সময় বন্ধুকে ‘বিক্রির ক্ষমতা’ দেয়া হয়েছে জানালে স্ত্রী মুখের কাপড় এক টানে খুলে স্বামীর মুখোমুখি হয়ে তীব্র স্বরে বললেন, এ হথা তো তুই আরে ন ক’! অর্থাৎ স্বামীর বন্ধুকে তার হয়ে বাড়ি বিক্রির ক্ষমতা তিনি দেননি। কর্মকর্তা এরপর সত্যায়নে রাজি হলেন না। কাগজপত্র ঠিক করে আনার পরামর্শ দিলেন। স্বামী বেজায় বিরক্ত হয়ে কর্মকর্তার সাথেও খুব একটা শোভন ব্যবহার করতে পারলেন না। বেরিয়ে যেতে যেতে স্ত্রীর সাথে যে আচরণ প্রদর্শন করলেন, তাতে বোঝা গেল স্বামীর ক্ষমতা বাড়ি গিয়ে প্রয়োগ করবেন তিনি।

এরপর বেশ কয়েক দিন গেল। কাগজপত্র ঠিক করে না আনলেও স্বামী ভদ্রলোক নানান প্রভাবশালী পক্ষ দিয়ে কর্মকর্তাকে টেলিফোনে বোঝাতে চাইলেন, তার স্ত্রী ‘অশিক্ষিত’ নারী বলে সব কথা বুঝিয়ে বলতে পারেননি, কাগজপত্র ঠিক আছে কেননা ‘শিক্ষিত’ স্বামী খুব ভালোভাবে বোঝেন এবং কর্মকর্তা স্বামীর পরিচিতি ও প্রভাবকে আমলে নিয়ে চোখ বন্ধ করে সত্যায়ন করতে পারেন। কর্মকর্তা চোখ বন্ধ করতে রাজি হলেন না। তখন দূতাবাস প্রধানের কাছে নালিশ গেল, তিনি অসহযোগিতা করছেন। সেই ঘোলা জলে ঢেউ লেগেছিল আরও, যখন স্বয়ং ভদ্রলোকের ‘শিক্ষিত’ বড় মেয়ে বাবা কর্তৃক বিগত সময়ে মায়ের ঠকে যাওয়ার আরও নানা তথ্য নিয়ে শেষ সম্বল বাড়িসহ জমি হাতছাড়া হওয়া ঠেকাতে দুর্দান্ত ভ‚মিকা রেখেছিলেন। বিস্তারিত বললে ঔপন্যাসিকা দাঁড়িয়ে যাবে নির্ঘাত।

কয়েক বছর পরে, এই তো ক’দিন আগে সেই মেয়েটির মাধ্যমে সেই কর্মকর্তার সাথে টেলিফোনে কথা বলতে গিয়ে সেই মা অঝোরে কাঁদলেন। তিনি এখনো প্রবাসী। আর প্রবাসে বসেই তিনি নিজের শেষ সম্বল সেই বাড়িসহ জমির দেখভাল করতে পারছেন, ‘পাওয়ার অব এটর্নি’ দিতে হচ্ছে না। কী বিস্ময় তার কণ্ঠে! বলছেন, কীভাবে তিনি খাজনা পরিশোধ করলেন। আসলে, প্রবাসে বসেই মেয়ের সাহায্য নিয়ে কম্পিউটারের কয়েক ক্লিকের মাধ্যমে একটু আগেই খাজনা পরিশোধ করেছেন তিনি। জাতীয় পরিচয় পত্র দিয়েই কাজটি করতে পেরেছেন তিনি এবং ভেবেছেন, এত সহজ সব কিছু! মেয়ে জানালেন মা’কে, জন্ম নিবন্ধন নম্বর দিয়েও সম্ভব সহজ করে তোলা কাজটি। তখন তিনি বিস্ময়কে আনন্দে পরিণত করতে মনে করলেন সেই বিষাদ দিনের কথা। মনে পড়ে গেল সেই কর্মকর্তার কথা। তিনি তার এই বিস্ময়মাখা আনন্দ সেই ‘আফা’র সাথে ভাগ করে নিতে চান। সত্যিই এ এক বিস্ময় সকল প্রবাসীর কাছে। ভ‚মিসংক্রান্ত সকল সেবা এখন ডিজিটাল পদ্ধতিতে করা সম্ভব। প্রবাসে বসেই ই-নামজারি, ই-মিউটেশন, ই-ল্যান্ড ট্যাক্স পরিশোধ করা সম্ভব।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানে যেসব অসাধারণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, তার সুফল এই ডিজিটাল ভ‚মিসেবা। এখন এটি পরিণত হচ্ছে ডিজিটাল ও স্মার্ট ভ‚মিসেবায়। এই ডিজিটাল ও স¥ার্ট ভ‚মিসেবা নামক উদ্যোগে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বেশ কিছু ডিজিটাল ও স্মার্ট উদ্যোগ। এইসব উদ্যোগ কিন্তু স্মার্ট বাংলাদেশের অর্থাৎ ‘স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট গভর্নমেন্ট, স্মার্ট ইকোনমি ও স্মার্ট সোসাইটির সাথে সম্পৃক্ত। এর ফলে কি ঘটছে ও ঘটতে যাচ্ছে, তা আন্দাজ করা প্রবাসী সেই মায়ের জন্য সম্ভব না হলেও তিনি কিন্তু ঠিক এরকমটিই চাইতেন মনে মনে। আমরা এই দেশের সকল দেশি ও প্রবাসী নাগরিক মাত্রই তো চাই সব ভ‚মি অফিস ক্যাশলেস হোক্, তা-ই হচ্ছে।
ভ‚মিসেবা উদ্যোক্তা তৈরিতে ভ‚মিকা রাখবে। অর্থাৎ ভ‚মিসেবার জটিলতার কারণে এর আগে যেসব উদ্যোক্তাগণ আইডিয়া বাস্তবায়নে সাহস পাননি, তারা যেন খুব উৎসাহ নিয়ে উদ্যোগ নিতে পারেন।

ডিজিটাল ভ‚মিসেবার সব উদ্যোগ যেহেতু সাইবার নিরাপত্তার বিশেষ দাবি রাখে, সেহেতু ডিজিটাল ও স্মার্ট ভ‚মিসেবার অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হচ্ছে সাইবার নিরাপত্তায় বিশেষায়িত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি ও ফার্মের এখন আর অভাব নেই। এর মধ্যেই ডিজিটাল ভ‚মিসেবার অ্যাপ চালু হয়ে গেছে এবং সকল জনগণ যেন এই অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল ও স্মার্ট ভূমিসেবা গ্রহণ করতে উদ্যোগী হন, সে বিষয়ে গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দপ্তর ও মাঠ পর্যায়ের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা গণসচেতনতা সৃষ্টির কাজটি করছেন, যা ক্রমশঃ আরও বেগবান হবে বলে আশা করা যায়।

কিউআর কোড স্ক্যান করেই, অর্থাৎ সম্পূর্ণ ডিজিটাল উপায়ে ভ‚মিসেবার অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন গ্রাহকরা। তাৎক্ষণিকভাবে এই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা সরকারের আয় বাড়াবে এবং ভ‚মিসেবা সংক্রান্ত গ্রাহক হয়রানির পাশাপাশি মধ্যসত্ত¡ভোগী দালাল ও অসাধু কর্মকর্তাদের দুর্নীতি প্রতিহত করবে।

মধ্যপ্রাচ্যের সেই প্রবাসী নারী ডাকযোগে তার খতিয়ান পেয়ে গেছেন। তিনি তো এখন আর সব গ্রাহকদের মতো ভ‚মিসেবা হটলাইন ১৬১২২ নম্বরে কথা বলে ভ‚মি পরামর্শ সেবা গ্রহণ করছেন। তার মেয়েটি টেলিফোন রাখার আগে হেসে জানালেন, মা এখন স্মার্ট হয়ে গেছেন! এতসব উন্নয়ন ভ‚মিসেবায় নারীর ক্ষমতায়নকে আরও সংহত করছে, নয় কি?

সবশেষ খবর এবং আপডেট জানার জন্য চোখ রাখুন বাংলাদেশ গ্লোবাল ডট কম-এ। ব্রেকিং নিউজ এবং দিনের আলোচিত সংবাদ জানতে লগ ইন করুন: www.bangladeshglobal.com

সর্বশেষ খবর

আরো পড়ুন